দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য আবারো ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ডলারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ নির্দেশক প্রায় দুই বছর পর আগস্টে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছিল।
দেশের ডলার প্রবাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে, যা বিওপি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা বিওপির সর্বশেষ প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, চলতি হিসাবের পাশাপাশি প্রথম প্রান্তিকে দেশের সামগ্রিক লেনদেন ঘাটতিও বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে বিওপির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৬ কোটি ডলারে, আগস্টে ছিল ১৩৯ কোটি ডলার। তবে বিওপির ঘাটতি গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় অনেক কম। ওই সময় এ ঘাটতি ছিল ২৮৫ কোটি ডলার।
বিওপির ঘাটতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পূরণ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এ সূচক ইতিবাচক ধারায় না ফিরলে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর শেষে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে (বিপিএম৬) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৯৮৭ কোটি বা ১৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি সপ্তাহেই এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া আমদানি দায় পরিশোধ করতে হবে। এরপর রিজার্ভ নেমে আসবে ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের বিরাজমান অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট অব ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আকুর বিল পরিশোধের পর আমাদের রিজার্ভ তো কিছুটা কমবেই। কার্ব মার্কেটে ডলারের ক্ষেত্রে কিছুটা টানাপড়েন অব্যাহত আছে। রফতানি আয় স্বাভাবিক গতি এখনো ফিরে পায়নি। তবে রেমিট্যান্স আয় বাড়ার কারণে ডলারের চাপ কিছুটা কমেছে। তা সত্ত্বেও আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ রয়ে গেছে। একদিকে করপোরেট খাতের উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাপের মধ্যে। বিনিয়োগের পরিবেশও সহায়ক হয়নি। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। অন্যান্য খাতেও টানাপড়েন রয়েছে।’
যতক্ষণ দেশের সার্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ টানাপড়েন চলতেই থাকবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি স্বাভাবিক না হলে রফতানি আয়ও স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে না এবং অন্যান্য খাতেও সমস্যা থাকবে। আর এর প্রভাব প্রতিফলিত হবে বিওপির ওপর। তাই আমাদের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকে জোর দিতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের আমদানি ব্যয় ছিল ১ হাজার ৫০৬ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা ১ হাজার ৫১৯ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। সে হিসাবে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রথম প্রান্তিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি আয় ছিল ১ হাজার ৫ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ১ হাজার ৫৬ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। রেমিট্যান্সের বড় উল্লম্ফনের মধ্যেও ব্যয়ের তুলনায় ডলার প্রবাহ না বাড়ায় সরকারের চলতি হিসাব ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। সেপ্টেম্বর শেষে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে এ হিসাবে ১৮৩ কোটি ডলার ঘাটতি ছিল।
দেশে প্রায় তিন বছর ধরে ডলার সংকট চলছে। এ কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতিও উঠেছিল রেকর্ড উচ্চতায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ ছিল রেকর্ড ১ হাজার ১৬৩ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষেও এ হিসাবে ৬৫১ কোটি ডলারের ঘাটতি হয়। তবে চলতি অর্থবছরের আগস্টে এসে তা উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছিল। আগস্ট শেষে এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১৫ কোটি ডলার। চলতি হিসাব ঋণাত্মক ধারায় চলে গেলেও দেশের আর্থিক হিসাব (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) অবশ্য উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছে। সেপ্টেম্বর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ডলার।